বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

কয়েক ঘণ্টা‌র মধ্যে ভারতের উপকূলে আছড়ে পড়বে যশ

রিপোটারের নাম / ১২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৬ মে, ২০২১
add

বুধবার দুপুর নাগাদ ভারতের উত্তর ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানতে পারে যশ। সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত না হানলেও এরই মধ্যে ভারি বর্ষণ ও জোয়ারের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে।

গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার শঙ্কা নিয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘যশ’ পৌঁছে গেছে ভারতের ওড়িশা উপকূলের আড়াই শ কিলোমিটারের মধ্যে। এ সময় ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছিল।

ভারতের পারাদ্বীপ এবং সাগরের মাঝখানে ধামরার উত্তরে এবং বালাসোরের দক্ষিণে স্থলভাগে প্রবেশ করবে যশ। সেইসময় ঝড়ের গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ১৩০-১৪০ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার বেগ কখনও কখনও ঘণ্টায় ১৫৫ কিলোমিটারে পৌঁছে যেতে পারে। তার প্রভাবে ইতিমধ্যে ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সবথেকে বেশি প্রভাব পড়বে পূর্ব মেদিনীপুরে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে বৃষ্টি-ঝড় হলেও তা আমফানের মতো বিধ্বংসী হবে না।

আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সঙ্গে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। আর পূর্ণিমার প্রভাবে উপকূলীয় জেলার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে ছয় ফুটের বেশি উচ্চতার জোয়ার প্লাবিত হতে পারে।

এরই মধ্যে ঝড়টির প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যাচ্ছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলার নিচু এলাকা এবং চরাঞ্চলগুলোতে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকার বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে ঢুকতে শুরু করেছে পানি। অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ উপচেও পানি ঢুকছে। বাঁধ না থাকা কিছু এলাকা এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে। নদ-নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট পানি বেড়েছে।

যশের প্রভাবে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনেও ঢুকে পড়েছে। সুন্দরবনসহ বিভিন্ন নদী-খালে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ফুট পানি বেড়েছে। সুন্দরবনের দুবলার চরসহ জেলেপল্লীগুলোর বেশির ভাগ এলাকায়ই পানি ঢুকেছে। বনের কোনো কোনো অংশ দেড় থেকে দুই ফুট পানিতে ডুবেছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ত্রাণ ও দুযোগ মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জানায়, করোনা সংক্রমণের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে তিন গুণ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শতভাগ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা, সবার জন্য মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিশ্চিত করা হয়েছে। বুদ্ধপূণির্মা উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি থাকলেও উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশের ঘূর্ণিঝড়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এনডিআরসিসি, সিপিপি অধিশাখা ও সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো খোলা থাকবে।

আজ বুধবার দুপুর নাগাদ এ ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও ওড়িশার পারাদ্বীপের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে উপকূল পেরিয়ে স্থলভাগে উঠে আসতে পারে। তখন বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন ভারতের আবহাওয়াবিদরা। এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫০৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইয়াসের প্রভাবে ইতিমধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বুধবার ভোর থেকেই ভারী বর্ষণ শুরুর পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া থাকবে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থাকবে মূলত উপকূলের জেলাগুলোতেই। আর পূর্ণিমার কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে দুই থেকে চার ফুট অধিক উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন টাইফুন অ্যান্ড ওয়ার্নিং সেন্টারের পূর্বাভাস বলছে, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১৯ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। এটি দ্রুত উপকূলের দিকে এগোচ্ছে এবং বাতাসের গতিবেগও বাড়ছে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। জোয়ারের পানি ফুলে-ফেঁপে উঠছে। আজ বুধবার সকালের মধ্যে তা আরো শক্তি বাড়িয়ে মারাত্মক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। উপকূলে আঘাতের সময় বাতাসের গতিবেগ আরো বাড়বে।

এদিকে সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্ফানের মতো এবারও সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় প্রথম রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যে পথ ধরে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এগোচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে আঘাত এলেও সুন্দরবন আবারও সুরক্ষা প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে। তবে পূর্ণিমার কারণে উঁচু জলোচ্ছ্বাস হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের জীব-বৈচিত্র্য অতীতের মতো এবারও ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রথম ধাপে তীব্র গতির বাতাসকে বাধা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়কে দুর্বল করার কাজটি করে সুন্দরবন। সুন্দরবনে বাধা পেয়ে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের উচ্চতাও কমে। এতে উপকূলের ক্ষয়ক্ষতিও কমে আসে।

ইতিমধ্যে বরিশালের কীর্তনখোলা, মেঘনা, পায়রা, বিষখালী, বলেশ্বরসহ নদ-নদীগুলোতে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে কীর্তনখোলাতীরের পলাশপুর, মেঘনাতীরের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, তুলাতলীর বাকেরগঞ্জ, বরগুনার তালতলী, সদর, পাথরঘাটা, ভোলার চরফ্যাশন ও তজুমদ্দীন, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকছে।

ভোলার চরফ্যাশনের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচর ও চর কুকরী তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পাতিলা, ঢালচর, চরনিজাম ও চরমানিকাসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে জোয়ারের পানি ঢুকেছে। এতে ওই এলাকার লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এদিকে ঝালকাঠির নলছিটিতে গতকাল সকাল ১১টার পর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চর আন্ডা গ্রামে বেড়িবাঁধ না থাকায় পুরো এলাকা জোয়ারে ডুবে গেছে। দশমিনার চর বোরহান, বাঁশবাড়িয়া ও পাতার চর এবং বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন, চর বাসুদেবপাশা, চর কালাইয়া, চর শৌলা, চর মমিনপুর এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া গলাচিপার পানপট্টি ইউনিয়নে বোর্ড স্কুলের কাছের বেড়িবাঁধ ও তালতলী ইউনিয়নের গ্রামর্দ্দন এলাকার বাঁধে ফাটল ধরেছে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ, গাবুরা এলাকার বিভিন্ন বাধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে। এসব বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে উপকূলবাসী।

খুলনার কয়রার সাত স্থানের বাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্বীপ জেলা ভোলার চর চটকিমারা, রাজাপুর, কাচিয়া মাঝের চর, মদনপুর, ঢালচর, চরনিজাম, কলাতলীর চর, সোনার চর, কাউয়ার টেকসহ অসংখ্য চর প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে জোয়ারে বাগেরহাটের ভৈরব, মোংলার পশুর, মোরেলগঞ্জের পানগুছি, শরণখোলার বলেশ্বর নদ-নদী এবং বিভিন্ন খালে স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় ফুট পানি বেড়েছে। ইয়াস ধেয়ে আসার খবরে বাগেরহাটসহ উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে একধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলোচ্ছ্বাস হতে পারে—এমন শঙ্কায় নদীপারের মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। বিশেষ করে শরণখোলা, মোংলা ও মোরেলগঞ্জের নদীপারের মানুষের মধ্যে ইয়াস আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, জোয়ারের পানি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন বনের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়েছে। বনের কোনো কোনো অংশ দেড় থেকে দুই ফুট পানিতে ডুবে গেছে। বিভিন্ন বৃক্ষরাজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে কোনো বন্য প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ